টানা বৃষ্টি। রাজধানীর মিরপুর, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার সড়কগুলো কোমরসমান পানিতে ডুবল। তবু বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। গণপরিবহন-সংকট আর তীব্র জলাবদ্ধতা ঠেলে ভিজতে ভিজতেই তাঁদের অফিসের পথ ধরতে হয়। কারণ, বেসরকারি খাতের হাজিরা খাতায় 'জলাবদ্ধতা'র জন্য দেরিতে আসার কোনো বিশেষ ছাড় নেই।
তবে রাস্তাঘাটের এই কঠিন যাতায়াত যন্ত্রণার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র মানসিক ও কাঠামোগত শোষণ সহ্য করতে হয় তাঁদের অফিসের চারদেয়ালের ভেতরে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ দেশের বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের জীবন আসলে এক প্রচ্ছন্ন 'দিন আনি দিন খাই' চক্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে করপোরেট পোশাক আর গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ঘুরলেও মাস শেষে তাঁদের পকেট শূন্য হয়ে যায়। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে যাতায়াত ভাড়া ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেলাতে মেলাতে এই কর্মীরা নিজেদের মৌলিক ও মানবিক অধিকারের কথা একপ্রকার ভুলেই যান।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রথম ও প্রধান সংকট হলো বছরের পর বছর আটকে থাকা পদোন্নতি আর নামমাত্র ইনক্রিমেন্ট। ঢাকার একটি বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছর ধরে কর্মরত অর্ণব রহমান বলেন, 'পাঁচ বছর ধরে একই পদে আছি। কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়েছে, কিন্তু ইনক্রিমেন্ট হয়েছে নামমাত্র। ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির এই বাজারে একই বেতনে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রম আইনে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের কথা বলা হলেও আমাদের প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা খাটতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত এই শ্রমের জন্য কোনো ওভারটাইম বা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয় না।'
একই সংকটের কথা জানান একটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্তরের কর্মকর্তা আহসান মিজু। তিনি বলেন, 'কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনেও অফিসের কাজ করতে হয়। অফিসের অভ্যন্তরীণ নোংরা রাজনীতি ও চাটুকারিতার কারণে যোগ্য কর্মীরা অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল বসের সুনজরে না থাকার কারণে অনেকের পদোন্নতি আটকে থাকে।'
বেসরকারি খাতের এই শোষণের চিত্র আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন সামান্য অজুহাতে বা ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের জেরে ছাঁটাইয়ের খাঁড়া নেমে আসে। একটি স্বনামধন্য গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে বসের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে এক সহকর্মীকে হঠাৎ চাকরিচ্যুত করা হয়। এমনকি তাঁর পাওনা টাকাও আটকে রাখা হয়েছে অন্যায় অজুহাতে। তিনি বলেন, 'বেসরকারি চাকরিতে কোনো কাজের নিশ্চয়তা নেই, যেকোনো সময় চাকরি চলে যেতে পারে।'
বেসরকারি খাত গবেষকদের মতে, সরকারি খাতের নতুন পে কমিশনের সুপারিশ ও বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার সময়ে এই বৈষম্য আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল ধাপে ধাপে কার্যকর হতে যাচ্ছে এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন একলাফে ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বেসরকারি কর্মীদের চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত।
শ্রম বিধিমালা-২০১৫ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক সুবিধা যেমন প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি কিংবা গ্রুপ ইনস্যুরেন্স দেওয়ার নিয়ম থাকলেও দেশের অধিকাংশ বেসরকারি মালিকপক্ষ তা খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলে তাঁদের চাকরির কোনো স্থায়িত্ব নেই, নেই পেনশন বা ন্যূনতম কোনো আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষাও।
নগর ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই হারিয়ে যাওয়া সময়ের পুরো আর্থিক ও মানসিক লোকসান বেসরকারি কর্মীদের একাই বহন করতে হচ্ছে।
বৃষ্টি থামলে রাস্তার জলজট হয়তো কেটে যায়, কিন্তু এ দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর জীবনের অদৃশ্য শোষণ আর বেতন স্থবিরতার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সহজে কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
- Tags:
- নিউজ
- বেসরকারি চাকরি

আপনার মতামত লিখুন :